মার্কিন ঋণের ঝুড়ি খালি করছে চীন: ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিক্রির আসল কারণ ও বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি খবর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে: চীন ৬০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করেছে। এই খবরটি আংশিক সত্য হলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ২০২৬ সালের শুরুতে ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়, বরং এক দশকের কৌশলী পদক্ষেপের চূড়ান্ত রূপ।
চীন ও মার্কিন বন্ড: আসলে কী ঘটছে?
অনেকে মনে করেন চীন এক দিনেই এই বিপুল বন্ড বিক্রি করেছে। আসলে তা নয়। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে চীনের কাছে ছিল প্রায় ১.৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন বন্ড। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, গত কয়েক বছরে চীন তার পোর্টফোলিও থেকে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মার্কিন ঋণ ঝেড়ে ফেলেছে, যা তাদের সর্বোচ্চ হোল্ডিংয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ।
চীন কেন এই পথ বেছে নিল? (মূল কারণসমূহ)
চীন কেন বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ মার্কিন বন্ড থেকে সরে আসছে, তার পেছনে চারটি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. "রাশিয়া শিক্ষা" ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়ার রিজার্ভ জব্দ করে, তখন বেইজিং সতর্ক হয়ে যায়। চীন বুঝতে পেরেছে যে, যদি কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের বিরোধ বাড়ে, তবে তাদের সম্পদও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই তারা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সম্পদ সুরক্ষিত করছে।
২. স্বর্ণের দিকে ঝোঁক (The Gold Pivot)
মার্কিন বন্ড বিক্রি করে চীন সেই টাকা দিয়ে প্রচুর স্বর্ণ কিনছে। পিপলস ব্যাংক অফ চায়না (PBOC) গত কয়েক বছর ধরে রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ মজুত করেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে চীনের স্বর্ণের রিজার্ভ ৭৪ মিলিয়ন আউন্স ছাড়িয়ে গেছে। তাদের লক্ষ্য হলো 'পেপার মানি' কমিয়ে বাস্তব সম্পদে রিজার্ভ রাখা।
৩. ইউয়ানের মান রক্ষা
আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা মুদ্রা 'ইউয়ান'-এর মান স্থিতিশীল রাখতে মাঝেমধ্যেই চীনকে ডলার বা মার্কিন বন্ড বিক্রি করতে হয়। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মুদ্রার পতন রোধ করার চেষ্টা করে।
৪. মার্কিন ঋণের বোঝা
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতো চীনও হয়তো মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপুল ঋণ ভবিষ্যতে মার্কিন অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হতে পারে।
এর প্রভাব কী হতে পারে?
চীনের এই বন্ড বিক্রির প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে:
-
সুদের হার বৃদ্ধি:
চীন যখন বন্ড বিক্রি করে, তখন বাজারে বন্ডের সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে সুদের হার (Yield) বেড়ে যায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জন্য মর্টগেজ রেট বেড়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সুদের হার যদি ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে একটি গড় আমেরিকান বাড়ির মর্টগেজ পেমেন্টে মাসিক ১০০ ডলার পর্যন্ত খরচ বেড়ে যেতে পারে। -
ডলারের একাধিপত্য হ্রাস:
একে বলা হয় 'ডি-ডলারাইজেশন'। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একক ক্ষমতা কমতে পারে। -
নতুন ক্রেতার খোঁজ:
চীনের জায়গায় এখন জাপান ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা হয়ে উঠছে।
শেষ কথা
চীনের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর একমুখী নয়। "চি-মেরিকা" (China + America) নামক যে অর্থনৈতিক যুগ ছিল, যেখানে চীন আমেরিকাকে ঋণ দিত আর আমেরিকা চীনের পণ্য কিনত—সেই যুগের অবসান ঘটছে। এর পরিবর্তে গড়ে উঠছে এক নতুন বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা।