Metal

দ্য গ্রেট ডিকাপলিং: কেন ২০২৬ সালে বিনিয়োগের সব পুরোনো নিয়ম ভেঙে যাচ্ছে?

5 min read
দ্য গ্রেট ডিকাপলিং: কেন ২০২৬ সালে বিনিয়োগের সব পুরোনো নিয়ম ভেঙে যাচ্ছে?

আপনি যদি বর্তমানে বিনিয়োগ বাজারের খবরাখবর রাখেন, তবে আপনার মনে হতে পারে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে। সাধারণত বিনিয়োগের নিয়ম হলো—শেয়ার বাজার যখন খুব ভালো চলে, তখন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে পরিচিত সোনা বা রুপার দাম কমে যায়। আবার তেলের দাম বাড়লে জিনিসের দাম বাড়ে, এটাই আমরা দেখে এসেছি।

কিন্তু ২০২৬ সাল সব পুরোনো নিয়ম উল্টে দিয়েছে। একদিকে Nasdaq এবং S&P 500 রেকর্ড ভাঙছে, অন্যদিকে সোনা ও রুপার দামও রকেটের গতিতে বাড়ছে। আর সবথেকে অবাক করা বিষয় হলো, এসবের মাঝখানেও জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত কমছে। একেই বলা হচ্ছে "এভরিথিং র‍্যালি"—অর্থাৎ সবকিছুর দাম একসাথে বাড়া। কেন এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি? চলুন তিনটি সহজ পয়েন্টে এর কারণগুলো দেখে নিতি।

১. টেকনোলজির ম্যাজিকশেয়ার বাজার কেন থামছে না? আগে ধারণা করা হতো সোনা বাড়লে মানুষ ভয় পেয়ে শেয়ার বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই ভয় আর কাজ করছে না।

এআই (AI) এখন বাস্তবের হাতিয়ার: গত কয়েক বছর এআই নিয়ে যে মাতামাতি ছিল, বড় কোম্পানিগুলো এখন তার সুফল পেতে শুরু করেছে। তাদের খরচ কমছে আর আয় বাড়ছে অবিশ্বাস্য গতিতে। এটিই মূলত শেয়ার বাজারকে উপরে টেনে তুলছে।

বাজারে টাকার স্রোত: সরকার বিভিন্ন প্রজেক্ট আর টেকনোলজিতে এত বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করছে যে বাজারে নগদের কোনো অভাব নেই। সুদের হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও এই বাড়তি টাকাই শেয়ার বাজারকে চাঙ্গা রাখছে।

২. আস্থার সংকট: মানুষ কেন সোনা ও রুপা কিনছে? যদি টেক কোম্পানিগুলোর আয় এতই ভালো হয়, তবে মানুষ কেন আবার সোনা কিনছে? এর মূল কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।

ডলারের বিকল্প খোঁজা: বিশ্বের অনেক দেশ এখন রিজার্ভ হিসেবে ডলারের বদলে সোনা জমা করছে। তারা মন্দার ভয়ে নয়, বরং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে চাইছে।

রুপার বিশেষত্ব: রুপা এখন আর শুধু গয়নার ধাতু নয়। এআই সার্ভার আর সোলার প্যানেল তৈরিতে প্রচুর রুপা লাগে। কিন্তু সেই তুলনায় জোগান কম। এই তীব্র চাহিদাই রুপার দামকে ইতিহাসের চূড়ায় নিয়ে যাচ্ছে।

৩. তেলের রহস্য: সস্তা তেল যখন আশীর্বাদ সবচেয়ে বড় ধাঁধা হলো—সবকিছু বাড়লেও তেলের দাম কেন কমছে? সাধারণত তেলের দাম কমা মানে অর্থনীতির মন্দা, কিন্তু এবার কারণটা ভিন্ন।

তেলের বন্যা: ভেনেজুয়েলা এবং আমেরিকা এখন রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন করছে। বাজারে চাহিদার চেয়ে জোগান এখন অনেক বেশি।

সাশ্রয়ী অর্থনীতির ইঞ্জিন: তেল সস্তা হওয়ার ফলে কোম্পানিগুলোর পণ্য পরিবহনের খরচ কমে গেছে। অ্যামাজনের মতো ডেলিভারি কোম্পানি বা বড় ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ খরচ কমছে। ফলে তাদের লাভ বাড়ছে, যা শেয়ার বাজারের গ্রাফকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছে।

ইতিহাসের সতর্কবার্তা: যখন বাতাসের মোড় ঘোরে ইতিহাস বলে, যখন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের সম্পদ (যেমন স্টক আর সোনা) একসাথে বাড়ে, তখন সেই আনন্দ খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না।

**১৯৭৯ সালের শিক্ষা: **তখন স্বর্ণ এবং শেয়ার একসাথে বেড়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সরকারকে সুদের হার ২০% পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছিল।

**২০০৭-২০০৮ এর সংকট ** কমোডিটি এবং স্টক একসাথে বাড়ার পর হঠাৎ যখন বাজারে টাকার সংকট দেখা দিল, তখন মানুষ তাদের লোকসান মেটাতে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল এবং সব বাজার একসাথে ধসে পড়েছিল।

বিনিয়োগকারীদের জন্য ২০২৬ সালের গাইড

সম্পদ (Asset)বর্তমান ভূমিকা ও কখন সাবধান হতে হবে
Nasdaq / SPXএআই ও গ্রোথ কোম্পানির লাভের ইঞ্জিন। এআই কোম্পানিগুলোর আয় কমতে শুরু করলে সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
Gold / Silverমুদ্রার মান রক্ষাকারী ঢাল। যদি ইউএস সরকার তাদের ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন ঝুঁকি ও গুরুত্ব দুটোই বাড়ে।
Crude Oil (তেল)বৈশ্বিক ব্যবসার চাকা সচল রাখে। দাম ৫০ ডলারের নিচে নামলে ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।

পরিশেষে: আমরা এমন এক সময়ে আছি যখন পুরোনো সব নিয়ম কাজ করছে না। উৎসব যখন সবথেকে রঙিন হয়, তখনই প্রস্থান করার পথটি চিনে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

Share this post